দেশের মানুষকে কম খাওয়ার পরামর্শ দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী : বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে ভেজাল না খেয়ে প্রয়োজনে কম খেতে হবে। তাহলে ভেজালকারীরা খাবারে আর ভেজাল দেবে না। শিগগিরই আমরা ভেজালবিরোধী নতুন আইন করবো। প্রস্তাবিত এ আইনে যিনি ভেজালের অভিযোগ করবেন ও তথ্য দেবেন, জরিমানার ২৫ শতাংশ টাকা তাকে দিয়ে দেয়া হবে। আগামী ৭ থেকে ৮ দিনের মধ্যেই দ্রব্যমূল্য ও ভেজাল সমস্যা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কে আজাদ বলেন, ‘খাদ্যে ভেজাল সমস্যার জন্য মূলত তিনজন দায়ী। প্রথমত ব্যবসায়ীদের নেতা হিসেবে আমি, দ্বিতীয়ত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ডিজি এবং বাণিজ্যমন্ত্রী নিজে।
বাজারের লাগাম কার হাতে!: নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন, ক্রেতার কোনো স্বস্তি নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সব ধরনের অস্ত্র এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেড় মাস আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তারা ‘নো লস নো প্রফিট’ নীতিতে ব্যবসা করবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হাঁকডাক, টিসিবির সব উদ্যোগ বিফলে যাচ্ছে। লাগাম ছাড়া এখন নিত্যপণ্যের বাজার। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের হাতে সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলছেন, চিনি ছাড়া আর সব কিছুর দাম নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, বাজার এতো বেশি মনিটরিং করা হচ্ছে যে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা আপত্তি তুলেছেন।
ক্রেতার বেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান: সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা : পণ্য মোড়কের গায়ে খুচরা মূল্য না লেখা থাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, মোড়কের গায়ে উল্লেখিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরিসহ বিভিন্ন অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৭ প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এদিকে বিএসটিআইয়ের অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, গাজীপুর ও জনসন রোডে ভেজালবিরোধী অভিযান চালায়। অভিযানে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের ৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৪৭০ কেজি খেজুর, ২৩ কেজি আঙ্গুর জব্দ করা হয়। এছাড়াও এক ব্যক্তিকে ৮ মাসের কারাদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালতের দলটির কয়েকজন সদস্য সাধারণ ক্রেতা সেজে সোনার বাংলা সমবায় সমিতির মার্কেটের মেসার্স মাজেদা জেনারেল স্টোর থেকে এক লিটারের সয়াবিন তেলের একটি বোতল কিনে। বিক্রেতা আব্দুল আলী বোতলের গায়ে ১২১ দাম লেখা থাকলেও ১২৩ টাকায় বিক্রি করে এবং রশিদ দেয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা রশিদসহ তেলের বোতল নিয়ে দোকানে গিয়ে উপস্থিত হন। এ সময় ভুল হয়েছে বলে বিক্রেতা ক্ষমা প্রার্থনা করে। এছাড়া বাটখারার ওজন কম থাকা, সরকার নির্ধারিত চিনির দাম প্রতি কেজি ৬৫ টাকার চেয়ে বেশি ৭৫ টাকা দাম উল্লেখিত মিশন রিফাইন্ড চিনির প্যাকেট সংরক্ষণের অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মিশন রিফাইন্ড চিনির এক কেজির মোড়কের গায়ে খুচরা লেখা আছে ৭৫ টাকা। এটির উৎপাদনকারী আব্দুল মোনেম রিফাইনারি লিমিটেড এবং এটি বাজারজাত করেছে মিশন ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেড।
ওষুধ, মিষ্টি, কোমল পানীয় ও চকলেট তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি চিনি কিনতে পারবে না: চিনি-ভোজ্যতেল বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা: পরিশোধন কারখানাগুলো পরিবেশক ছাড়া অন্য কারও কাছে ভোজ্যতেল ও চিনি বিক্রি করতে পারবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর ফলে সিরাপ তৈরির ওষুধ কারখানা, মিষ্টি, কোমল পানীয়, চকলেটসহ এ ধরনের পণ্য তৈরির কারখানাগুলো বিপাকে পড়বে। কারণ, কোম্পানি থেকে সরাসরি চিনি কিনতে পারলে দাম কম পড়ত। এখন পরিবেশকদের কাছ থেকে কিনতে গেলে যে পরিমাণ দরকার হবে, তা-ও পাওয়া যাবে না। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভোজ্যতেল ও চিনির ক্ষেত্রে চালান প্রথার (ডিও) পরিবর্তে যে পরিবেশক প্রথা চালু করা হলো, তা বাস্তবায়ন করতেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেন গতকাল সকালে সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেন, পরিশোধন কারখানাগুলো এ দুটি পণ্য বিক্রি করতে পারবে শুধু পরিবেশকদের কাছে। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে না। এ ব্যাপারে অবশ্য বৈঠকে উপস্থিত থাকা পরিশোধন কারখানার মালিকদের কেউ কোনো কথা বলেননি।
‘তেল বা চিনি কিনলে ডাল খেজুর কিনতেই হবে’: ‘আমরা বিক্রি করি প্যাকেজ সিস্টেমে। তেল বা চিনি কিনলে ডাল, খেজুর কিনতেই হবে।’ টিসিবির ডিলারের কর্মীরা নিয়মটা জানিয়ে দেন। এই নিয়মের কথা লেখা আছে টিসিবি সদর দপ্তরের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রেও। পাঁচ কেজি চিনি বা তেলের সঙ্গে পাঁচ কেজি ডাল কেনা বাধ্যতামূলক। যদিও গতকাল কারওয়ান বাজারের ওই খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র খোলাই হয়নি। ইন্দিরা রোডের মামুনুর রশীদ (৬২) এর আগেও এসেছিলেন টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্রে। সেদিন ছিল ছুটির দিন, বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ ছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল রোববার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে আসতে। এই বিক্রয়কেন্দ্র খোলা থাকে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। গতকাল বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে টিসিবি সদর দপ্তরের নিচতলার বিক্রয়কেন্দ্রে সকাল ১০টায় এসে তিনি দেখেন তালা ঝুলছে। আর বিজ্ঞপ্তি টাঙানো, মজুদ না থাকায় খুচরা বিক্রি আপাতত বন্ধ। কবে খুলবে, কখন খুলবে কেউ জানে না। এরই মধ্যে সেখানে ভিড় জমিয়েছেন ক্রিসেন্ট রোড থেকে আসা খন্দকার মনিরুজ্জামান (৪৮), মগবাজার থেকে আসা হাসান (৫৫) প্রমুখ। বিজ্ঞপ্তি পড়ে হাসান জোরে জোরে বলে উঠলেন, আল্লাহ আল্লাহ। তাঁরা ছাড়বার পাত্র নন, তিনতলার টিসিবি দপ্তরে গিয়ে জানতে চাইলেন কেন বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ, কখন খুলবে।